Posted by: অগ্নি on: জুন 25, 2008
ধর্মগুলোর সবচেয়ে পরিশীলিত সমালোচনাকেও সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক বলে মনে হবে। ধর্মগুলো মানুষের তৈরী। হ্যাঁ, এটাই সবচেয়ে নরম নিন্দা। এমনকি যে মানুষের হাতে এটা তৈরি হয়েছে, সেই মানুষও কোন নবী, ত্রাণকর্তা অথবা গুরুর অনেক কথার সাথে একমত হবে না। তারপরও অন্তত: পরবর্তীকালের উদ্ভাবন এবং অগ্রগতির অর্থ তারা বলার আশাটুকু করতে পারে। এটা জানা কথা যে, তারা অর্থাৎ সাধারণ মানুষ কথা বলা শুরু করলেই ধর্ম বা ধর্মের দালালরা তাদের বাধা দেবে। তারপরও তারা দাবী করে যে তারা জানে। শুধুমাত্র জানা নয়, তারা সবকিছু জানে। ঈশ্বর অস্তিত্ববান, শুধু এটুকু জানা নয়। তারা বলে যে ঈশ্বর আমাদের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন: ঈশ্বর আমাদেরকে সৃষ্টি করেছে, এই বিশ্বকে পরিচালনা করছে; এছাড়াও ঈশ্বর আমাদের কাছ থেকে অনেক কিছু প্রত্যাশা করেন। আমরা কি খাব, কি পড়ব, এমনকি আমরা যৌনতাকে কোন দৃষ্টিতে দেখব ইত্যাদি। অন্যভাবে বললে বলা যায়, এ ধরণের বিস্তৃত এবং জটিল আলোচনায় আমরা খুব খুব স্বল্প বিষয়ে অনেক অনেক বেশি জানি। তারপরও মানুষকে আলোকিত করার প্রত্যাশা আমরা করি। যাবতীয় দলাদলির মধ্যে একটি বিষয়ে আমরা সবাই একই দলভুক্ত।
আমাদের চাহিদা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য ধর্মগুলোর মধ্যে রয়েছে এ বিষয়ে কারও কোন মতভেদ নেই। এ ধরণের বোকামো কিছুটা অহংকারের সাথে মিশ্রিত থাকে। এই ধরণের অহংকারকে ব্যবহার করে বিতর্ক থেকে বিশ্বাসকে বাদ দিতে হবে। যে ব্যক্তি নিজের ভাবনা সম্পর্কে স্থির প্রতিজ্ঞ এবং নিজের বিশ্বাসের স্বপক্ষে স্বর্গীয় অজুহাতকে ব্যবহার করেন, তিনি আসলে মানব প্রজাতির শৈশবাবস্থায় রয়ে গেছেন। আমরা দীর্ঘকাল আগেই সেই অবস্থাকে বিদায় জানিয়েছি। আর অন্য সব বিদায়লগ্নের মত এটাকেও দীর্ঘায়িত করতে চাই না।
ধর্মের সাথে বিতর্ক থেকে সবধরণের বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এটা সমাপ্তি নয় বরং এখান থেকেই শুরু করতে হবে। দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, মানব প্রকৃতি নিয়ে সব ধরণের আলোচনা এই ধর্মের সাথে বিতর্ক দিয়েই শুরু করতে হবে। কারণ সুন্দর ভবিষ্যত অথবা সভ্য জীবনের জন্য যে বিতর্ক তার সমাপ্তি থেকে নতুন করে শুরু করা যায় না। ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বরূপ বেশ স্পষ্ট। কারণ এখনও জীবনের বিবর্তন ঘটছে, একে অস্বীকার করা সম্ভব নয়।
মৃত্যুভয়, আঁধারের রাজ্য, অজানা জগত এবং সবগুলোর জন্য যতোক্ষণ পর্যন্ত কাতর হইনি ততোক্ষণ পর্যন্ত প্রাণের বিবর্তন থেমে যাবে না। এই কারণে ধর্মের সাথে বিতর্ককে আমি থামাই না। আপনারা হয়ত বলবেন যে, এটা আমার জন্য স্বাভাবিক। কিন্তু ধর্ম কি আমাকে একই রকম প্রশ্রয় দেবে? আমি এটা জিজ্ঞাসা করছি, কারণ আমার সাথে আমার ধর্মভাবাপন্ন বন্ধুদের কিছু বাস্তব ও গুরুতর পার্থক্য আছে। যারা সত্যিকারের সৎ বন্ধু তারা অবশ্য এতে সায় দেবে। আমি তাদের গথিক রীতির ক্যাথেড্রাল (Cathedral) দেখে বিস্মিত হই। এক মুর্খ ব্যবসায়ীর কাছে আসা আরবী কোরানের চীৎকারকে “সম্মান” করি। এমন কি হিন্দু ও জৈনদের সান্তনা বা স্বস্তি পাবার জায়গাটি সম্পর্কেও আমি আগ্রহ বোধ করি। কোন রকম বিনয়ের বিনিময় ছাড়াই আমি এমন করতে থাকব। কিন্তু আসলে ধর্ম শেষ পর্যন্ত কোন কিছু করতে সক্ষম নয়। আমি যেভাবে বলছি এবং যেভাবে আপনি পড়ছেন, ধর্মভাবাপন্ন মানুষেরা এইসব কথাকে আক্রমণ করতে, ধ্বংস করতে চায়। তারা আমাকে এবং আপনাকে খুন করার জন্য নানারকম পদ্ধতির কথা চিন্তা করে। বিভিন্ন মানবিক কষ্টকর অর্জনের বিষয়ে যে সব অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে তাতে আমি আমি একটা কথাই বলতে পারি। আর তা হল -”ধর্ম সবকিছুকে বিষাক্ত করে তোলে।”
সমাপ্ত
Posted by: অগ্নি on: জুন 21, 2008
ধর্ম সবকিছুকে বিষাক্ত করে তুলছে
ধর্ম অসংখ্য মানুষকে অপেক্ষাকৃত ভাল আচরণ করতে তো শেখায় না বরং বেশ্যার দালালের মতো নোংরা মনের ও গণহত্যাকারীর মতো হিংস্র হতে উৎসাহ দেয়। কিন্তু আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল নিজের মনে জোড় বাড়ানোর জন্য আমাদের কোন প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন নেই। আমাদের প্রতিদিন অথবা প্রত্যেক সপ্তাহে অথবা কোন বিশেষ দিনে একত্রিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। অযোগ্য, সম্মানহীন কাউকে বড় করতে গিয়ে এবং আমাদের সাধুতা প্রচার করে নিজেকে ছোট করার জন্য কোন দলভুক্ত হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমরা নাস্তিকরা কোন মোল্লাগিরি সমর্থন করি না কিংবা নিজের মতবাদ পালনের জন্য পুলিশিগিরিও করি না। কোন চিত্র বা বস্তুকে (এমনকি তা যদি কোন বই হয় তাকেও) শ্রদ্ধা করার উপযুক্ত বলে মনে করি না। বরং তথাকথিত ত্যাগের মহিমা বা ভদ্রতাকে আমরা পরিত্যজ্য বলে বিবেচনা করি। আমাদের কাছে পৃথিবীর কোন জায়গা পবিত্রতর হতে পারে নঅ। আমরা মনে করি তীর্থযাত্রা আসলে হাস্যকর লোকদেখানো কার্যক্রম ছাড়া কিছুই নয়। কোন পবিত্র দেয়াল, গুহা, পাথর বা দালানের নামে গণহত্যাকে আমরা কোনক্রমে মেনে নিতে পারি না। আমরা ধীরগতিতে বা তাড়াহুড়া করে পাঠাগার বা আর্টগ্যালারির এক পাশ থেকে অন্য পাশে গমনাগমনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারি। অথবা কোন বন্ধুর সাথে সৌন্দর্য বা সত্যতার স্বরূপ নিয়ে সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা করতে করতে লাঞ্চ সারতে পারি। এইসব বইয়ের জগত বা সাংস্কৃতিক আলোচনাপূর্ণ লাঞ্চ বা গ্যালারি পরিদর্শনের অর্থ খুব স্পষ্ট। যদি আমাদের মধ্যে কিঞ্চিত ধর্মবিশ্বাস তৈরি হয়েও থাকে তবে তা এসেছে এই সাংস্কৃতিক জগত থেকে, কোন অন্ধকারাচ্ছন্ন গুহা থেকে নয়। আমাদের প্রিয় চিত্রকর, সুরকার প্রমুখের সৃষ্টি আমাদের মনোজগতে পরিবর্তন ঘটিয়েছে। অগাস্টিন, একুইনাস, মাইমনিডস এবং নিউম্যান আমাদের চেতনাকে সমৃদ্ধ করেছে। এই প্রভাবশালী বিদগ্ধজনেরা অনেক বিপদজনক বিষয় নিয়ে লিখেছেন। কখনও কখনও তা অবশ্য বোকামীর পর্যায়েও চলে গেছে। অসুখের কার্যকারণ, এই সৌরজগতে পৃথিবীর অবস্থান ইত্যাদি বিষয়ে তারা হাস্যকর নানা মন্তব্যও করেছেন। বর্তমান কাল পর্যন্ত তাদের মতবাদের টিকে না থাকা বা আগামীতেও তাদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি না হবার পিছনে এগুলোই সাধারন কারণ। ধর্ম হল এরকমই একটি অস্পষ্ট প্রশংসার জিনিস।
ধর্ম সমকালে নয় বহুকাল আগেই তার কিছু মহানুভবতা প্রদর্শন করেছিল। একালে নয়, তার সবচেয়ে মূল্যবান বাণী বা উদ্দীপনামূলক বক্তব্য দিয়েছে সেই অতীতকালে। এটা তো বটেই, এছাড়া কোন ভালোকাজে ধর্মের বাকরুদ্ধ করা হয়েছিল সেও অনেকদিন আগের কথা। এমন ঘটেছিল সাহসী ভিন্নমতাবলম্বী লুথারিয়ান গির্জার যাজক দিয়েত্রিচ বনহেফের (Dietrich Bonhoeffer) এর জীবনে। নাৎসীদের অপকর্মে সাহায্য না করার কারণে তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল। প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত কোন নবী বা ধর্মনেতার জীবনে এমন ঘটেনি। আমরা এমন কাউকে পাইনি যার বক্তব্যে পুনরুক্তি নেই। তারা সবসময় গতকালের কথার প্রতিধ্বনি তুলেছেন। কারও কারও ধর্ম সম্পর্কিত স্বীকারোক্তি পাসকেলকে উদ্ধৃত করতে গিয়ে নিজেদের সংকীর্ণ মনোভঙ্গিকে প্রকাশ করে ফেলেছে। যখন আবার ওই প্রচারকার্য ভন্ডামো ও নিরানন্দে পর্যবসিত হয়, তখন তারা সি. এস. লুইস (C. S. Lewis) এর নামোল্লেখ না করে পারে না। দুই পদ্ধতির কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য একইরকম। এটা আসলে সবসময় ঘাড়ের উপর চেপে থাকে এমন অনিচ্ছুক মানসিক চাপ থেকে আসে। কত উদ্যম যে এই মানসিক চাপকে লালন করেছে তা বিশ্বাস করা কঠিন। প্রত্যেক সূর্যোদয়কে নিশ্চিত করতে আজটেকরা প্রত্যেক বিশেষ দিনে একজন মানুষের বুক চিরে ফেলত। একেশ্বরবাদীরা তাদের উপাস্যকে এর চেয়েও বেশি বিরক্ত করেছে। ‘স্বর্গীয় পরিকল্পনার এক অংশ ব্যক্তি’ -এমন মিথ্যাচার করার জন্য কত ভণ্ডামীই না করা হয়েছে। কিন্তু কোনটাই কাজে লাগে নি।
কারও পাপ সম্পর্কে সচেতন করার জন্য কি পরিমাণ আত্মবোধ বিসর্জন দেয়া হয়েছে? কিছুই না। কতবার তারা লজ্জা পেয়েছে? কখনও নয়। বিজ্ঞানের নতুন উদ্ভাবনের সাথে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য কতভাবে ধর্মকে মোচড়ানো হয়েছে? অকাজের অনুমান কতগুলো তৈরি করা হয়েছে? বিজ্ঞানের নতুন চিন্তার সাথে মানুষের নিজ হাতে তৈরি ফেরেশতার পবিত্র বাণীর মিলে যাবার জন্য ধর্মীয় সূত্রসমূহকে কত নতুনভাবে সাজানো হয়েছে? কত সাধু, কত অলৌকিক ঘটনা, কত ধর্মসভাই না ওইসব মতবাদকে প্রতিষ্ঠিত করতে আবার সময়ান্তরে সেগুলোকে বাতিল করতে ব্যবহার করা হয়েছে।
ঈশ্বর তার নিজের আদলে মানুষকে তৈরি করেনি। সহজ করে বললে বলা যায় যে, ঈশ্বর বা ধর্মের সংখ্যা অতিরিক্ত বেড়ে যাবার এটাই সহজ ব্যাখ্যা। বিশ্বাসগুলোর নিজেদের প্রতি ও নিজেদের মধ্যে যে পরস্পরবিরোধীতা তা সহোদর হত্যার মত একই দোষে দুষ্ট। আর এর ফলে সভ্যতার অগ্রগতিকে শুধু প্রতিহত করাই হয়েছে।
অসমাপ্ত
Posted by: অগ্নি on: জুন 9, 2008
ধর্ম সবকিছুকে বিষাক্ত করে তুলছে
ক্রিস্টোফার হিচেনস
অনুবাদক: অগ্নি অধিরূঢ়
ধর্মের বিরুদ্ধে চারটি পুরনো অভিযোগ আছে। প্রথমত: মানুষ ও মহাবিশ্বের সৃষ্টি সম্পর্কে ধর্ম সম্পূর্ণ ভুল তথ্য দেয়। দ্বিতীয়ত: এটা ভুল যে নির্বাণ লাভের জন্য আত্মগত উপলব্ধিকে শক্তি যোগায় একমাত্র ধর্ম। তৃতীয়ত: যৌনতাকে অস্বাভাবিক ও বিপদজনকরূপে উপস্থাপনের কারণ ও ফলাফল। চতুর্থত: ধর্ম সম্পূর্ণভাবে শুভচিন্তার ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত।
আমার বালকোচিত কণ্ঠস্বর পরিবর্তিত হওয়ার আগেই আমি এই অভিযোগ চারটি আবিষ্কার করেছিলাম। শুধুমাত্র এই কারণে আমাকে আক্রমণাত্মক বলা যেতে পারে-এমনটা আমি কোনমতেই মনে করি না। অবশ্য এর পাশাপাশি আমি আরও একটি সুস্পষ্ট অশ্লীল ঘটনা চিহ্নিত করতে পেরেছি। এটা হল ‘কর্তৃপক্ষের দালালদের দ্বারা ধর্ম ব্যবহৃত হচ্ছে’। আমি নৈতিকভাবে নিশ্চিত যে, আরও লক্ষ লক্ষ মানুষ আমার মত একইভাবে ধর্ম সম্পর্কে একই উপসংহার টেনেছে। আমি ডজনেরও বেশি দেশে শত শত জায়গায় এ ধরণের মানুষদের সাথে মিশেছি। এদের মধ্যে কেউ কেউ কখনও কোন কিছু বিশ্বাস করত না। আবার কেউ বা জটিল সব সমস্যায় পরে বিশ্বাসকে বিসর্জন দিয়েছে। তাদের কারও কারও জীবনে এমন মুহূর্ত আছে যেগুলো অশান্তির কালো পর্দায় ঢাকা ছিল। সেই সময়গুলোতে তারা মানসিকভাবে কিছুটা বিপর্যস্ত ছিল। আবার কারও কাছে তা কেয়ামতের আগাম বার্তা বহন করে এসেছিল। অবশ্য সমস্যা মিটে যাবার পর তাদের মানসিক অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। তারা এর ফলে নিজেদের নৈতিক পক্ষপাতকেও ভালভাবে চিনতে পেরেছে।
আমার নিজের এবং সহচিন্তকদের কাছে এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। আমাদের বিশ্বাস আদতে কোন বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। কোন কিছুতে আস্থা রাখা আমাদের মূল নীতি নয়। আমরা শুধু যে বিজ্ঞান ও কার্যকারণের উপর নির্ভর করি বা আস্থা রাখি তা নয়। কারণ এগুলো পর্যাপ্ত উপাদানের চাইতেও বেশি প্রয়োজনীয় বলে পরিগনিত। কিন্তু যা কিছু বিজ্ঞানের বিরোধীতা করে বা যথাযথ কারণকে এড়িয়ে চলে তাকে আমরা অস্বীকার করি। আমাদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু একটি বিষয়ে আমরা সবাই একমত। আমরা মুক্তান্বেষা, মুক্তমনাকে শ্রদ্ধা করি, নিজস্ব গরজে নতুন চিন্তাকে স্বাগত জানাই। কিন্তু তাই বলে আমরা আমাদের আদর্শ নিয়ে কোন রকম গোঁড়ামী করি না।
বাধাগ্রস্থ বিবর্তন এবং নব্য ডারউইনবাদ এর অপূর্ণ শূন্যস্থানগুলো বিষয়ে প্রফেসর রিচার্ড ডকিন্স এবং প্রফেসর স্টিফেন জে গুল্ড এর মতবিরোধ হওয়াটা আমাদের কাছে এক সুগভীর ব্যঞ্জনা বয়ে নিয়ে আসে। আমাদের কাছে তা কাম্য ছিল না, কারণ যদি আমাদের কোন সীমাবদ্ধতা থাকে তবে উপযুক্ত প্রমাণ ও যথাযথ কারণ পর্যালোচনাসাপেক্ষে আমরা আমাদের অজ্ঞতাকে পূর্ণ করতে পারব। কিন্তু তা না করে যদি পরস্পরকে দোষারোপ বা বাতিল করা হয় তাহলে কেমন হবে? (রিচার্ড ডকিন্স এবং ড্যানিয়েল ডেনেট এর প্রতি আমার একটা নিজস্ব বিরক্তিআছে। তারা নাস্তিক বা অবিশ্বাসী শব্দটির পরিবর্তে বুদ্ধিদীপ্ত (Bright) শব্দটি ব্যবহারের প্রস্তাব করেছেন। আমার মতে এর ফলে তারা নিজেদেরকে কিছুটা হলেও ছোট করেছেন।) আমরা কেউ বিস্ময় এর প্রতি প্রলুব্ধতা, রহস্যময়তা এবং শক্তিমানের প্রতি ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধা থেকে মুক্ত নই। আমাদের সঙ্গীত, শিল্পকলা, সাহিত্য আছে। আমরা এখন জানি যে, বিশেষ রকমের নীতিনৈতিকতার জন্য পৌরাণিক বইয়ের নীতিকাহিনীর চাইতে সেক্সপীয়র, টলস্টয়, শিলার, দস্তয়েভস্কি এবং জর্জ এলিয়ট এর দ্বারস্থ হওয়াটা অধিকতর ভাল।
সাহিত্য ধর্মগ্রন্থ নয়। বরং তা মনকে পুষ্টি জোগায়। এর আর কোন উপমা নেই, এমনকি আত্মাও একে সঠিকভাবে পরিষ্ফুট করতে পারে না। আমরা বেহেশত বা দোজখে বিশ্বাস করি না। এইসব মন ভোলানো বা হুমকির বিষয় এবং বেহেশতের লোভে ঘটানো অপরাধ অথবা বিশ্বাসের চাইতে বেশি হিংসাত্মক আর কোন কিছু সম্পর্কে কোন তথ্য এখনও পাওয়া যায় নি। (আসলে যদি কখনও সঠিক পরিসংখ্যান হয়, তাহলে আমি নিশ্চিত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে আরও তথ্য প্রমাণ পাওয়া যাবে।) আমরা শৈশবের ভিতর দিয়ে বেড়ে ওঠা ছাড়া একবার মাত্র বাঁচার ব্যাপারটি মেনে নিয়েছি। তার জন্যে আমরা সম্পূর্ণভাবে সুখী যে আমরা অবশ্যই আমাদের নিজেদের পরিবেশ, পথ তৈরি করে নেব।
আমরা এটা অনুমান করতে পারি যে শেষ পর্যন্ত যা সম্ভব হবে তা হল মানুষ তাদের সংক্ষিপ্ত ও সংগ্রামী জীবনের মর্ম যখন বুঝতে পারবে তখন তারা পরস্পরের সাথে আরও ভাল ব্যবহার করবে। আমরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি যে, ধর্ম ছাড়াও নৈতিকভাবে শুদ্ধ জীবন যাপন সম্ভব।
প্রথম প্রকাশ: মুক্তমনা
চলবে…..
Posted by: অগ্নি on: মে 24, 2008
ক্রিস্টোফার হিচেনস: অথচ কোথাও বলা নেই যে যিশুখ্রিস্ট এই পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছে।
স্যাম হ্যারিস: ঠিক, একটি বরফজমা ঝরণার তিনটি…
রিচার্ড ডকিন্স: তিনটি অংশ থাকে।
স্যাম হ্যারিস: এই অংশগুলো ট্রিনিটির( ত্রিত্ব) কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
ক্রিস্টোফার হিচেনস: হ্যাঁ। তাতো বটেই। আমরা একই বা ভিন্ন পথের ত্রিক (Triune)। আমরা এভাবেই পরিকল্পিত হয়েছি। চারমাথা ঈশ্বর হয়তো আর আসতে পারবে না।
স্যাম হ্যারিস: ঠিক (সহাস্যে)
ক্রিস্টোফার হিচেনস: অভিজ্ঞতা থেকে আপনি এসব জানেন। কিন্তু এটা এক বিরাট ধরণের পার্থক্য তৈরি করবে, এবং আমার ধারণা মানুষের অনেক সন্দেহ দূর করবে। তারা বুঝতে পারবে আমাদের আবেগ হল আমাদের ব্যক্তিত্বের বাড়তি মূল্যবোধ। এই অনুভূতি বিবর্তনের জন্য উপকারী নয়। আচ্ছা, আমরা এসব প্রমাণ করতে পারবো না, কিন্তু আমাদের জন্য এসব কথা কোন পরিবর্তন আনছে না। সব একই রকম থেকে যাচ্ছে। অতিপ্রাকৃতকে নিজের বলে ভেব না, এবং কোন প্রিস্টের সাথে কোনভাবে যুক্ত থেকো না কিংবা তাদের দলভুক্ত হতে যেয়ো না।
ড্যানিয়েল ডেনেট: হ্যাঁ। এটা দুঃখজনক ঘটনা যে মানুষ সাধারণ বুদ্ধিতে তাদের ঐশ্বরিক অভিজ্ঞতাকে বিশ্বাস করে না। তারা মনে করে ঈশ্বরের কাছ থেকে যেহেতু আসেনি সেহেতু তা যতটা দেখা যায় ততোটা কাঙ্ক্ষিত না। এটাই ধর্মের স্বপক্ষে একরকমের প্রমাণ। না, এটা যেমন দেখতে ঠিক তেমনই বিস্ময়কর। এটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তোমার জীবনে এটা বিশেষ মুহূর্ত এবং এটাই সেই মুহূর্ত যখন তুমি নিজেকে ভুলে যাবে। যে সব পদ্ধতিতে তুমি নিজেকে ভাবো তার চেয়ে হয় তো এভাবে তুমি আরো ভালো বোধ করবে। প্রকৃতির সমস্ত সৌন্দর্য এবং মহানুভবতাকে অনুভব করতে পারবে। এটার কথাই বলছিলাম এবং এটাই বিস্ময়কর। কিন্তু মানুষের কাছ থেকে যা আমি পেয়েছি এসব তার চেয়ে বেশি কিছু নয়।
রিচার্ড ডকিন্স: এটা ছিনতাই হয়ে গেছে। ছিনতাই করেছে…
ক্রিস্টোফার হিচেনস: হ্যাঁ, এটা সহ। আমার ধারণা এটা মানুষের ব্যক্তিত্বের এক ধরণের বিকৃতি অথবা ব্যর্থতা। আমি এসব খোলাখুলিই বলছি। কারণ ধর্ম মানুষকে নিজের কাছে নিজেকে ছোট করে দেয়। মানুষ কতটা আজ্ঞাবহ তা নির্ণয় করে। ধর্ম সবসময় মানুষকে আত্মোৎসর্গ করার জন্য চাপ দেয়। কিন্তু আসলে এটা এইসব মুহূর্তগুলি নিয়ে অস্বাভাবিক অভিযোগ করে, এটা বলে যে – আমি হঠাৎ বুঝতে পারলাম এই বিশ্বের যাবতীয় উদ্দেশ্য সব আমাকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে।
স্যাম হ্যারিস: হ্যাঁ, হ্যাঁ।
রিচার্ড ডকিন্স: হ্যাঁ।
ক্রিস্টোফার হিচেনস: এবং আমি এসবকে চরমভাবে অবজ্ঞা করি। আমার বিশ্বাস আমরা মানুষের এইসব অজ্ঞতা নিয়ে অনায়াসে হাসাহাসি করতে পারি।
স্যাম হ্যারিস: ঠিক।
রিচার্ড ডকিন্স: ঠিক।
ড্যানিয়েল ডেনেট: অবশ্য, আমিও এভাবে ভাবি। আমাদের এরকমই করা উচিত। সত্যি আমাদের অবশ্যই…
ড্যানিয়েল ডেনেট: “এটা সেটা নিয়ে প্রফেসর ডেনেট বিনম্র ছিলেন”- এ ধরণের ভাবনা ভাবতে ভাবতে আমি ক্লান্ত।
রিচার্ড ডকিন্স: হ্যাঁ।
ড্যানিয়েল ডেনেট: এবং হীন মনোভঙ্গি… এই ধারণা মানুষকে শ্বাসরূদ্ধকর উদ্ধত করে তোলে, এবঙ আমার ধারণা…
ক্রিস্টোফার হিচেনস: তোমরা যাই বলোনা কেন আমরা আসলে একদিকে বেশি জোর দিচ্ছি। আমার কথায় মন খারাপ কোরো না। আমি ঈশ্বরের জন্য কিছু অর্থহীন কাজ করার পক্ষে।
ড্যানিয়েল ডেনেট: হ্যাঁ। তা তো বলবেই।
(সমস্বরে অট্টহাটি)
Posted by: অগ্নি on: মে 15, 2008
স্যাম হ্যারিস: আমার মনে হয় সেই প্রশ্নের একটা উত্তর আছে। ভিন্ন একটি বিষয়ে আমাদের অজ্ঞতা দূর করবে। অথবা অন্তত: আমার ভিন্ন মতাদর্শকে খানিকটা আলোকিত করে তুলবে। এ বিষয়ে… আমার ধারণা, আমি আমার ধনুকের তেমন ক্ষতি না করেই বলতে পারি, আমি এখনও ‘আধ্যাত্মিক’, ‘অতিন্দ্রীয়’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে যাচ্ছি। অবিশ্বাসীদের আতঙ্ক যে আমি বুঝতে পারি, তা অবশ্য আমি স্বীকার করি। আমি জানি বিভিন্ন ধরণের দুর্লভ অভিজ্ঞতা আপনাদের হয়েছে। অবশ্য এ কথা শুধুমাত্র বিবেকের কোন তাড়না ছাড়া ধর্মবিষয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে বলছি। এবং শুধুমাত্র ধর্মবিষয়ে আলোচনার কথা এজন্য বলছি যে আসলে এসব কুসংস্কারে পূর্ণ প্রহেলিকা ছাড়া কিছুই নয়। অথচ এই ধর্ম কোন কারণ ছাড়াই আমাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক আলোচনাকে পণ্ড করে। কিন্তু এটা পরিস্কার যে জনগণের কিছু অসাধারণ অভিজ্ঞতা আছে। ধর্মকে তাদের গ্রহণ করার একাধিক কারণ থাকতে পারে। হয়তো তারা এতে নেশাগ্রস্ত অথবা বছরে পর বছর তারা জীবনগুহায় নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করছে। অথবা কিছু স্নায়ুবিক প্রতিক্রিয়ার ফল হিসেবে তারা ধর্মের মধ্যে ডুবে আছে। কিন্তু যাই বল না কেন ধর্ম বিষয়ে প্রত্যেকের নিজস্ব যৌক্তিক অভিজ্ঞতা থাকে। আর মানুষ নিজেকে পরিস্কার দেখতে পছন্দ করে। জীবনে সেই সব দিনগুলোই তার কাছে শ্রেষ্ঠতম যে দিনগুলোতে সে নিজেকে স্পষ্ট দেখতে পেরেছে। নিজেকে আবিষ্কার করতে পেরেছে। তোমরা জান, তারা প্রকৃতির মুখাপেক্ষী থাকে। মানুষ তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে তাকে মর্যাদা দেয়। তাকে আজ আমরা উপহাস বা খেলার পাত্রে রূপান্তরিত করেছি। এটাই সেই কারণ, আমি কেন একে ব্যঙ্গ করে নিজেকে নোংরা করবো? এসব বলার কারণ হল, অন্ততঃ জনগণের দৃষ্টিভঙ্গী থেকে মানুষের জীবনের প্রধান গুরুত্বপূর্ণ আবেগ নিয়ে তোমরা উপহাস করছো আবার তাকে ভাগাড়ে নিক্ষেপ করছো।
রিচার্ড ডকিন্স: দেখুন স্যাম, আমি আপনার সাথে একমত হতে পারছি না। আপনি যে কথাগুলো বললেন তা খুব ভাল কথা, কারণ আপনার কথা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, অতিন্দ্রীয় রূপ লাভ করার ক্ষেত্রে ধর্ম একমাত্র বিষয় নয়। এটা একটা ভাল প্রস্তাব। কারণ কারও নাস্তিক হওয়াটাও একটা রাজনৈতিক অধিকার। অবিশ্বাসী না হয়েও উপায় নেই। কারণ নীতিবোধের বিভিন্নতা কোন সাহায্য করতে পারে না। এজন্য সবখানে বিভিন্ন সংস্কৃতির সংমিশ্রণ থাকাটা অপেক্ষাকৃত ভাল। কিন্তু তোমার সাথে আমার একটু মতভেদ আছে। আমি বিতর্ক না করলেও এর মূল্য কমে যাবে না।
স্যাম হ্যারিস: ঠিক।
ক্রিস্টোফার হিচেনস: তুমি জিনোম এর অগ্রদূত ফ্রান্সিস কলিন্স এর সেই বিখ্যাত উক্তিটি নিশ্চয় শুনেছো। তিনি বলেছেন- একদিন পাহাড়ে চড়তে গিয়ে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে তিনি এতটাই বিমুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন যে, তারপর তিনি পাহাড় থেকে হামাগুড়ি দিযে নেমে এলেন এবং যিশুর কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। একটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক পরিসমাপ্তি।
(সবাই তার সাথে একমত হলেন)
Posted by: অগ্নি on: মে 13, 2008
ক্রিস্টোফার হিচেনস: তরুণ বয়সে এই তালিকা নিজের সাথে রাখতাম। এ বিষয়ে একজন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যের সাথে নিয়মিত আলোচনা হত। অবশ্য তাদের পল্লবগ্রাহী জ্ঞান সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার সাথে সাথে বিলীন হয়ে গেছে। অবশ্য ওদের অনেকে অশেষ ত্যাগ স্বীকার করেছে, জীবনে তাদের অনেক ভুগতে হয়েছে। জীবনের পথে নিরন্তর লড়াই করতে হয়েছে। তোমরা জান, তাদের স্বপ্ন এক আদর্শ সমাজকে ঘিরে। তাদের প্রধান উৎসধারা মরে গেছে; কিন্তু কেউ কেউ আছেন যারা হতাশ হয়ে যাননি। আদর্শকে ধরে রেখেছেন, পরিত্যাগ করেননি। কারণ এটাও এক ধরণের স্বীকারোক্তির সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে সম্পৃক্ত। কিন্তু হ্যাঁ, এটা অবশ্যই যে, তার মানে, যদি আমাকে কেউ বলে ‘তুমি সোভিয়েত ইউনিয়নের কথা তাদেরকে কিভাবে বলবে। তুমি কি জাননা একথা বললে ওরা কাঁদতে শুরু করবে। তোমার কথা ওদের হৃদয়ে আঘাত দেবে। শোনো নিজেকে উপহাসের পাত্র করে তোলো না। অযথা অযৌক্তিক কথা বোলো না। অবশ্য এ ধরণের একই রকম একাধিক ঘটনার কথা আমি শুনেছি।
ড্যানিয়েল ডেনেট: লোকজন আমার কথার ভঙ্গিকে যখন রূঢ়, বিদ্বেষপূর্ণ, আক্রমণাত্মক এবং ভয়ংকরভাবে উস্কানীমূলক বলে, তখন আমার মনে হয়…. আচ্ছা আমি যদি তেল রাজনীতি কিংবা ঔষধ শিল্প নিয়ে কথা বলি তাহলেও কি তাকে রূঢ় বলা হবে? এটা কি সীমানা ছাড়িয়ে যাবে, না।
রিচার্ড ডকিন্স: অবশ্যই তা হবে না।
ড্যানিয়েল ডেনেট: আমি মনে করি, তেল রাজনীতি বা ঔষধ শিল্পের মতো একইরকমভাবে ধর্মকেও যেন মূল্যায়ন করা হয়। আমি ঔষধ কোম্পানীর বিরুদ্ধে নই, তাদের কিছু কাজ আমার মোটেও পছন্দ নয়। আমি তাদের এইসব নীতির বিরোধীতা করি। আর ধর্মকেও আমি তাদের সাথে একই পংক্তিতে রাখতে চাই।
ক্রিস্টোফার হিচেনস: ট্যাক্স না দেবার অভিযোগ সহ।
ড্যানিয়েল ডেনেট: হ্যাঁ।
রিচার্ড ডকিন্স: হ্যাঁ।
ক্রিস্টোফার হিচেনস: অথবা রাষ্ট্রের ভর্তুকীর কথাও এর সাথে সংযুক্ত করা যেতেপারে।
রিচার্ড ডকিন্স: অন্যান্য সব বিষয়ের চাইতে রাষ্ট্রের কাছ থেকে ধর্ম যে সব সুবিধা নিয়ে থাকে আমি সেইসব বিষয় সম্পর্কে জানতে আগ্রহী। যে কোনভাবে হোক আমরা ধর্ম বিশ্বাস করি বা না করি বিষয়টা এখন পরিস্কার। কিছু ঐতিহাসিক পরম্পরা ধর্মের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করেছে। কারণ একটি উগ্র আক্রমণাত্মক আচরণ ধর্ম গ্রহণ করার পক্ষে সবসময় থেকেছে।
ড্যানিয়েল ডেনেট: আর সবচেয়ে বেশি মজা পেয়েছি তা হল… প্রথমে আমি রাগে উন্মত্ত হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু পরে মজা পেয়েছি। তাদের বিশ্বাসকে আক্রমণ করে এমন অবিশ্বাসীদের একটি তালিকা করা হয়েছে এটা জেনে আমি সত্যিই খুব মজা পেয়েছি।
রিচার্ড ডকিন্স: কিন্তু কিভাবে?
ড্যানিয়েল ডেনেট: আসল ঘটনা হল ধর্মে অবিশ্বাসী ব্যক্তিরাই আমার বইয়ের সবচাইতে ভয়ংকর সমালোচনা লিখেছে। তারা ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের অনুভূতিকে আঘাত করতে ভয় পেয়েছে। আতঙ্কগ্রস্থ হয়েছে। তারা আমাকে খুব খারাপভাবে শাস্তি দিয়েছে। যতটা কোন গভীর বিশ্বাসীও আমাকে দিত না।
রিচার্ড ডকিন্স: একেবারে ঠিক আমার অভিজ্ঞতা। হ্যাঁ, ঠিক একই অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে।
স্যাম হ্যারিস: তাহলে তোমাদের মধ্যে একজন এই দৃষ্টিভঙ্গিটাকে করুণা করছো? আমার মতে এটা এক রকমের সংশোধনবাদী ধারণা। এর প্রয়োজন আছে। তুমি জান মানুষকে তাদের পৌরাণিক বিশ্বাসের মধ্যে নিরাপদে রেখে দেয়া উচিত।
রিচার্ড ডকিন্স: আচ্ছা?
(চলবে)
Posted by: অগ্নি on: মে 9, 2008
রিচার্ড ডকিন্স: যে কোন কিছুর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অসন্তোষের পরিমাণ এবং ধর্মের অসন্তুষ্টির পরিমাণ এ দুয়ের তুলনা আমাকে বিমূঢ় করে দেয়। এ যেন অন্যরকমের এক শৈল্পিক আস্বাদ, যেমন সঙ্গীতের মূর্চ্ছনা, চিত্রকলার সৌন্দর্য বা রাজনীতির অনবদ্য ভঙ্গি। যতোটা চান ততোটা রূঢ় হয়তো আপনি হতে পারেন না, কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ আপনাকে প্রত্যাশার চাইতে আরও অনেক বেশি রূঢ় করে তুলবে। আমি এটা পরিমাপ করতে পছন্দ করি। সক্রিয়ভাবে আমি মানুষের এমন আচরণ নিয়ে গবেষণা করি। প্রিয় ফুটবল দল সম্পর্কে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস, কোন প্রিয় গান শুনে যে আনন্দ অনুভব করি অথবা অন্যকিছু। ধর্মপ্রাণদের রাগিয়ে দেবার জন্য আপনি কতদূর যেতে পারেন এটা দেখতে আমার খুব ভাল লাগে। এটাকে তুলনা করা যায়, উমমম….. আচ্ছা, আমি যা বললাম তা ছাড়া আর কি কিছু আপনাদের জানা আছে। ওদের চোখে আপনি দেখতে কতটুকু কুৎসিত এটা জেনে আমি বেশ তৃপ্তি পাই।
ক্রিস্টোফার হিচেনস: অথবা, আপনার স্বামী বা স্ত্রী অথবা বান্ধবী বা সঙ্গীর মুখচ্ছবি।
রিচার্ড ডকিন্স: হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ
ক্রিস্টোফার হিচেনস: হ্যাঁ, আপনি যা বলেছেন তা সত্যিই মজার। কারণ জন ডোনাহু নামের এক ভয়ংকর লোকের সাথে আমার প্রতিদিন ঝগড়া হয়। তিনি ক্যাথলিক ডিফেন্স লীগ এর একজন সক্রিয় সদস্য। এই সংঘ আধুনিক চিত্রশিল্পের উপর যারপরনাই খুব বিরক্ত। ‘প্রস্রাবরত যিশু’ বা ‘কুমারীর মাথায় হাতির মল’ এবং এ ধরণের আরও কিছুর কারণে তারা ব্লাসফেমি আইনের প্রতি মনোযোগী হচ্ছেন। আমার ধারণা এই যে আমরা পরস্পর অভিজ্ঞতা বিনিময় করছি এর প্রয়োজন আছে। সফোক্লিস বা অন্য প্রাথমিক যুগের একেশ্বরবাদীদের মত, হঠাৎ কোন গোপন কিছুকে উন্মুক্ত করা বা পবিত্র বস্তুকে অবজ্ঞা করার মত। গির্জার অবগুণ্ঠন উন্মোচন করা হোক তা আমরা অনেকেই চাই না।
রিচার্ড ডকিন্স: না, আসলেই না।
ক্রিস্টোফার হিচেনস: অথবা ধর্মীয় মূর্তিগুলোকে ফেলে দেয়া এরকম যে কোন কিছু সম্পর্কে এ কথা খাটে। তবে ধর্মের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আমি খুব মজা পাই।
স্যাম হ্যারিস: ঠিক, আমার ধারণা এই সমস্ত ব্যাপার হল… আমার ধারণা, আমাদের সমালোচনা একটু বেশি বেদনাপ্রদায়ী। এটা সহজবোধ্য যে, আসলে আমরা এমন নই। আমরা মানুষকে ব্যঙ্গ করি। কিন্তু পাশাপাশি আমরা এটাও বলি যে, তারা ভুল করছে। এর মানে, পদার্থবিজ্ঞান সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে বিজ্ঞানীরা হাস্যকর হয়ে ওঠেন না। আমার ধারণা, পৃথিবীতে কোনটা সত্য এটা যখন তারা খুঁজতে চায় তখন যে পদ্ধতি গ্রহণ করা হয় তা যৌক্তিক পদ্ধতি নয়। আর ধর্মের অন্তর্নিহিত অর্থ বাস্তবতার সাথে তুলে ধরতে হবে। আর এখনও তারা তাদের বিকৃত, প্রাচীন এবং পরিশেষে বিপদজনক প্রতিউত্তর দিয়ে আমাদের ভাবনাগুলোর বিরোধীতা করে। আমার ধারণা ওই সব ঘটনার সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব আমাদের নিজের।
ড্যানিয়েল ডেনেট: আচ্ছা, শোন, আসলেই কাউকে কিছু বলার জন্য বিনীত হবার কোন সুযোগ নেই।
স্যাম হ্যারিস: তুমি তোমার জীবনীশক্তির অপচয় করছো।
ড্যানিয়েল ডেনেট: নিজের জীবন নিয়ে তোমারও একইরকম সন্দেহ আছে নাকি? শুধুমাত্র একটা মিথকে মাথায় রাখার জন্য জীবনের সমস্ত উৎসাহ, উদ্দীপনা ব্যয় করে চলেছো এমন কি তোমার কখনও মনে হয়? অথবা তোমার বিবেচনাবোধ হয়তো জানে যে তোমার জীবন কিভাবে তুমি অপচয় করেছো। আসলে এসব বলার মার্জিত কোন উপায় নেই, বুঝলে? তারপরও আমাদেরকে এসব বলতে হবে। এভাবেই বলতে হবে। কারণ, হয়তো তারা বিষয়টা বুঝে আশ্বস্ত হবেন। যেমন আমরা নিজেরা বুঝেছি এবং নিজের জীবনে তা প্রয়োগ করে সানন্দ দিন যাপন করছি।
স্যাম হ্যারিস: ওহ! তা তো বটেই।
রিচার্ড ডকিন্স: ড্যান বার্টার বেশ কয়েকজন যাজকের একটি তালিকা করেছেন। তারা তাদের বিশ্বাসকে হারিয়ে ফেলেছেন কিন্তু তা প্রকাশ করার মত সাহস পাচ্ছেন না। কারণ ওই যাজকগিরি করাই তাদের জীবন। একমাত্র এই কাজটিই তারা ভাল জানেন এবং পারেন।
স্যাম হ্যারিস: হ্যাঁ, আমি তাদের একজনের কথা শুনেছি।
রিচার্ড ডকিন্স: তুমি শুনেছো? সত্যি?
(চলবে)
Posted by: অগ্নি on: মে 7, 2008
অনুবাদক: অগ্নি অধিরূঢ়
২০০৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর রিচার্ড ডকিন্স ফাউন্ডেশন (RDFRS http://richarddawkinsfoundation.org/) এর উদ্যোগে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। দুই ঘন্টাব্যাপী এই খোলামেলা আলোচনা সভায় বক্তারা ধর্ম বিষয়ক বিভিন্ন অভিজ্ঞতা পরস্পরের সাথে বিনিময় করেন। আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন:-
ধর্মের বিরুদ্ধে বই লেখার কারণে এই চার লেখক সম্প্রতি মিডিয়ার ব্যাপক মনোযোগ পাচ্ছেন। কিছু ইতিবাচক কিছু নেতিবাচক। নিম্নের আলোচনায় সাম্প্রতিক বই সম্পর্কে জনগণের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে তাঁরা মতবিনিময় করেছেন। সমকালীন বিশ্বে ধর্ম যেসব অনুষঙ্গের মুখোমুখি হচ্ছে সেই জটিল সমস্যা নিয়ে তারা আলোচনা করেছেন। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। উত্তরণের উপায় বলে দিয়েছেন।
ছবি তুলেছেন জোস টিমোনেন।
কুইকটাইম ভিডিও ডাউনলোড করুন: ফাইল ১ (৭৮.৭ মে.বা), ফাইল ২(৭৩.৬ মে. বা.)
টরেন্ট থেকে ডাউনলোড করুন: ফাইল ১, ফাইল ২
এমপি ৩ ডাউনলোড করুন: ফাইল ১ (২৬.৬ মে. বা.), ফাইল ২ (২৭.১ মে.বা.)
রিচার্ড ডকিন্স: কয়েকটা সাধারণ অভিযোগ আমাদের সবার বিরুদ্ধে আছে। আমরা উদ্ধত, কর্কশ, বিদ্বেষী, গলাবাজি করি ইত্যাদি। এইসব বিবিধ বিষয় নিয়ে আমরা কী ভাবছি?
ড্যানিয়েল ডেনেট: হা! হা! আচ্ছা! আমি বরং এতে আমোদ পাই। কারণ আমি ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদেরকে উদ্দেশ্য করে বই লিখেছি। যখন লিখছিলাম তখন খসড়া লেখাটি পবলভাবে ধর্মভাবাপন্ন কয়েক ছাত্রকে পড়তে দিয়েছিলাম। বাস্তবে একেবারে আশাতীত ঘটনা ঘটল। আমার লেখাকে মানসিক যন্ত্রণা তৈরী করার জন্য দায়ী করা হয়েছিল। ফলে আমাকে কিছু সমন্বয় করতে হয়েছে। কিন্তু তা পরিশেষে তেমন ভাল হয় নি। কারণ আমাকে কর্কশ এবং আক্রমণাত্মক প্রবণতার জন্য বারবার নিন্দা করা হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারলাম এ খেলায় জেতা যাবে না। এটা পুরস্কারহীন খেলা। ধর্মগুলো দারুণ ফন্দিবাজ। কোন রকম সমালোচনা সহ্য করা ধর্মগুলোর পক্ষে অসম্ভব। আর, এজন্য রূঢ় না হয়ে উপায় থাকে না।
রিচার্ড ডকিন্স: রূঢ় না হয়ে উপায় থাকে না? বলছেন কি?
ড্যানিয়েল ডেনেট: তারা কিন্তু আবেগের খেলা খেলে এবং এক বিশেষ রকম পছন্দের পক্ষে থাকে। অতএব আমাকে …. আমার কি রাগ করা উচিত নাকি চিৎকার করে সমালোচকদের উত্তর দিব। সমালোচনার উত্তরে চেচামেচি করবো? মানে আমি বলতে চাচ্ছি আমার কি চিৎকার করবো নাকি ঠোটদুটোকে বোতাম লাগিয়ে বন্ধ করে দেব।
স্যাম হ্যারিস: ঠিক বলেছেন। আপনাদের বক্তব্য লোকাচারকে ধ্বংস করে দেয়। আমার মনে হয় আমরা সকলে একই সমস্যার শিকার। ধর্ম যৌক্তিক সমালোচনাকে মেনে নেয় না। তা আপনি যতই আনুষ্ঠানিকভাবে বলুন না কেন, ধর্ম তা স্বীকার করে না। প্রিয় সেকুলারিস্ট এবং অবিশ্বাসীগণ এটা আপনারা হয়তো আগে থেকেই জানেন। তাই আমার মনে হয়, মানুষকে তাদের কুসংস্কার নিয়ে থাকতে দেয়া উচিত। এই সব হীন ধারণা যতই ক্ষতি করুক না কেন তাদের দিকে তাকানোর কোন দরকার নেই।
ড্যানিয়েল ডেনেট: হ্যাঁ, ঠিক এটাই বলতে চেয়েছিলাম। আমার বইয়ের নামকরণে এর ছাপ আছে। আমাদেরকে এই অর্গল ভাঙতে হবে। কিন্তু যদি জনগণের উন্মত্ততাকে অধিকার দেয়া হয় তাহলে আমার ধারণা আমরা দুজনই আরও বেশি আক্রমণ ও বিদ্রুপের শিকার হব। তারমানে তারিক রমজানকে যে পছন্দ করে তার সাথে শুধু মতের অমিল হওয়া নয়। বিষয়টা আরও কঠিন। তারিক রমজানকে চিনলেন না- আরে, তিনি এখন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নামজাদা বক্তা। অবশ্য বেশিরভাগ সময় তিনি তার নিজের প্রত্যাশার কথাই বেশিবেশি বলেন। কিন্তু যখন নারীকে পাথর ছোঁড়ার প্রসঙ্গ আসে তখন আইনের কথা বলেন। পাথর ছোড়া বিষয়ে স্থানীয় আইনের বাইরে তিনি যেতে চান না বা বেশি কিছু বলতেও চান না। আমার কাছে তাকে বিরক্তির চাইতে বেশি ভাল লাগেনি।
স্যাম হ্যারিস: ঠিক, হ্যাঁ, কিন্তু আমি ভাবছি….
ক্রিস্টোফার হিচেনস: বিদ্রুপ? শুধু বিদ্রুপ নয়, আসলে তারা হুমকি দিচ্ছিল।
স্যাম হ্যারিস: কিন্তু আপনি রেগে যাননি। এসব ব্যাপারে ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে কখনও জড়াতে দেখিনি। যেমন রমজানের কেসে আপনাকে শান্ত ও ধীর থাকতে দেখা গেছে। বিবিধ চিন্তাভাবনা থেকে প্রাপ্ত নীতিবোধ আপনাকে সতর্ক করেছে।
ক্রিস্টোফার হিচেনস: হ্যাঁ। কিন্তু সে হয়তো বলবে, তার মত মানুষেরা বলবে যে মোহাম্মদের ঐতিহাসিকতায় সন্দেহ পোষণ করে তাদের মনের গভীরে, মর্মঃস্থলে আমি আঘাত করেছি।
স্যাম হ্যারিস: ঠিক।
ক্রিস্টোফার হিচেনস: আচ্ছা, আমি, ঘটনা হল, প্রত্যেক মানুষই আক্রমণের শিকার হতে পারে। অন্তত: তাদের বিবেকের সততা দিয়ে এটা সবাই বুঝতে পারে। কুসংস্কারহীন ধর্ম কিংবা স্বর্গীয় স্বৈরাচার কোনটা সঠিক আর কোনটা বেঠিক আমরা তা জানিনা। আমরা বাঁচি আসলে….
স্যাম হ্যারিস: তুমি কি সত্যিই এমন আক্রান্ত হয়েছিলে? এর কারণ কি? শুধু কি পরস্পরকে ভুল বোঝাবুঝি নাকি অন্য কিছু?
ক্রিস্টোফার হিচেনস: না, আমি শুধু বলতে চাই এই ধরণের আপত্তিকর আক্রমণ যদি প্রকাশ্যে মেনে নেয়া হয় বিশেষ করে মিডিয়া যদি তা প্রচার করে তাহলে তা খারাপ হবে। আমার ধারণা আমাদেরকে আক্রমণের অভিযোগ আরও বেশি করে করতে হবে। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ আমরা পাবো না, ওরা দেবেও না, অথবা নিজেদেরকে নির্যাতিত সংখ্যালঘু হিসেবে পরিচয় দিতে হবে। এটা বরং উল্টো বিপদ ডেকে আনবে। আমি এ বিষয়ে একেবারে নিঃশংসয়। আমি ড্যানিয়েলের সাথেও একমত। আসলেই আমাদের বিরুদ্ধে যে ধরণের আক্রমণ পরিচালনা করা হয় তাকে উপেক্ষা করার কোন উপায় নেই। কারণ আমরা যা বলি তা অনেক সময় প্রবলবিশ্বাসীর অন্তরের অন্তঃস্থলে আঘাত হানে। যেমন. আমরা যিশুর পবিত্রতা প্রত্যাখ্যান করি। এটা হয়তো তাদেরকে তীব্রভাবে ব্যথা দেয়। এটা আসলেই খুব খারাপ।
(অসমাপ্ত)
Posted by: অগ্নি on: এপ্রিল 30, 2008
আবার প্রথার কথায় আসি। এবার আমরা একে ভিন্নপদ্ধতিতে দেখবো। প্রথা বা ঐতিহ্য কেন আমাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ সেটা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি। নিজেদের জন্য উপযোগী পরিবেশে যেন সুস্থভাবে বেচেবর্তে থাকতে পারি সেজন্য প্রাণীরা বিবর্তিত হয়েছে। আফ্রিকার সমভূমিতে সিংহরা খুব ভালবাবে বাঁচতে পারে। ক্রেমাস স্বাদু জলের মাছ, আবার কাঁকড়ারা লবনাক্ত জল ছাড়া থাকতে পারে না। মানুষও একরকম প্রাণী। আমরা এই পৃথিবীতে অন্য মানুষদের সাথে মিলেমিশে বাঁচার উপযোগী করে তৈরি হয়েছি। আমরা সিংহ বা কাঁকড়া মত সাধারণত কোন খাবার শিকার করি না। বাজার থেকে বিক্রেতার কাছ থেকে কিনে নেই। তারা আবার উৎপাদকের কাছ থেকে কিনে আনে। মাছ যেমন পাখনা দিয়ে জলের মধ্যে ভেসে বেড়ায় আমরা তেমন মানুষের সমুদ্রে সাঁতার কাটছি। অন্য মানুষের সাথে আমরা বিভিন্নরকম সম্পর্ক তৈরি করি। আর এই সম্পর্ক তৈরিতে সাহায্য করে আমাদের বুদ্ধি। সমুদ্র যেমন লবনাক্ত জল দিয়ে ভর্তি, মানুষের পৃথিবীতেও তেমন জানার মত বিভিন্ন জটিল বিষয় আছে। যেমন ভাষা।
তুমি ইংরেজিতে কথা বল, কিন্তু তোমার বন্ধু অ্যান ক্যাথরিন কথা বলে জার্মান ভাষায়। তুমি তোমার নিজস্ব ’মানব সমুদ্রে’ সাঁতার কাটার উপযোগী ভাষায় কথা বল। আর কোন উপায় নয় শুধুমাত্র প্রথা বা ঐতিহ্যের মাধ্যমেই ভাষাকে আমরা পেয়েছি। ইংল্যান্ডে পিপ/পেপ (Pepe) বলতে কুকুরকে বোঝায়। কিন্তু জার্মানীতে বলে এইন হান্ড (ein Hund)। এর মধ্যে কোনটাই সঠিক নয় আবার কোনটাই অন্যটার চেয়ে বেশি সত্যি নয়। দুটো শব্দই উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। নিজের মত মানব সমুদ্রে সাঁতার কাটার সুবিধার জন্য শিশুদেরকে নিজেদের দেশেই ভাষা শিখতে হবে। নিজের মত মানুষদের সাথে আরও নানাকিছু করতে হলে তাকে অন্য আরও অনেক প্রথা ও ঐতিহ্যকে ব্লটিং পেপারের মত আত্মস্থ করতে হবে। মনে রাখবে প্রথাগত তথ্য বলতে যা দাদুর কাছ থেকে পিতা, পিতার কাছ থেকে নতুন প্রজন্ম পর্যন্ত চলে এসেছে তাকে বোঝায়। শিশুর মগজকে সব ধরণের প্রথাগত তথ্যগুলোকে পিপাসার্তের মত গলাধকরণ করতে হবে। কোনটা ভাল বা মন্দ তা বাছাই করার সামর্থ শিশুদের কাছ থেকে আশা করা যায় না। তাই তারা ভূত-পেত্নী, জ্বিন-পরী, ডাকিনী, দৈত্য ইত্যাদি বিশ্বাস করা সহ বিভিন্ন আজেবাজে শব্দ শিখে ফেলে।
এটা আসলেই দু:খজনক। কিন্তু করার কিছু নেই। কারণ শিশুরা তাদের চারপাশের সবরকমের তথ্যকে খুব দ্রুত শিখে ফেলে। বিশেষ করে বড়রা যা বলে তা সত্য-মিথ্যা, ঠিক-বেঠিক যাই হোক তাকে গভীরভাবে বিশ্বাস করে। বড়দের অনেক কথা বেশ তথ্যবহুল এবং বিভিন্ন প্রমাণসাপেক্ষে সত্যি একথা ঠিক। কিন্তু তারা যখন বিভিন্ন অর্থহীন বা বাজে কথা বলে তখন তা শেখা থেকে শিশুদের বিরত রাখার কোন উপায় নেই। এখন ওই শিশু যখন বড় হবে তখন সে কি করবে? সেও ছোটদেরকে একই কথা বলবে। তাই বলছিলাম, যখন কোন কিছু গভীরভাবে বিশ্বাস করা হয় তা সে যতই মিথ্যা হোক কিংবা বিশ্বাস করার মত কোন কারণ থাক বা না থাক, তা ছড়িয়ে পড়ে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বাহিত হয়ে যায়।
ধর্মের ক্ষেত্রেও কি এমনটাই ঘটেছে? সৃষ্টিকর্তা, স্বর্গ, মেরির মারা না যাওয়া , যিশুর পিতা কোন মানুষ নয়, প্রার্থনার উত্তর পাওয়া যায়, ওয়াইন রক্তে পরিণত হয় – এসবের কোনটার পিছনে কোন ভাল প্রমাণ নেই। তারপরও লক্ষ লক্ষ মানুষ এতে বিশ্বাস করে। এর কারণ হয়তো শৈশব কৈশোরে যখন সবকিছু বিশ্বাস করার মত তাদের বয়স ছিল, তখন বড়রা এসব বিশ্বাস করতে বলেছিল।
লক্ষ লক্ষ মানুষ ভিন্ন ভিন্ন ধারণায় বিশ্বাস করে কারণ শৈশবেই তারা ভিন্ন ভিন্ন ধারণার কথা শুনেছে। একটি খ্রিস্টান শিশুর চাইতে মুসলিম শিশুর অভিজ্ঞতা ভিন্নরকম। দুজনই এমনভাবে প্রভাবিত হয়ে বড় হয়েছে যে তারা নিজেকে সঠিক ও অন্যদেরকে বেঠিক বলে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে। এমনকি খ্রিস্টান, রোমান ক্যাথলিক, চার্চ অব ইংল্যান্ড, বিশপশাশিত গির্জা, মরমন প্রমুখেরা সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন ধারণায় আস্থা রাখে। আবার তারা নিজেকে সম্পূর্ণ সঠিক ও অন্যদের প্রত্যেককে ভুল বলে মনে করে। তুমি যে কারণে ইংরেজি আর অ্যান যে কারণে জার্মান বলে ঠিক একই রকম কারণে তারা ভিন্ন ভিন্ন ধারণায় বিশ্বাস করে। নিজ নিজ দেশে ইংরেজি বা জার্মানভাষা সঠিক। কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম নিজের দেশে সঠিক নাও হতে পারে। কারণ প্রত্যেক ধর্ম অন্য ধর্মকে মিথ্যা বলে প্রচার করে। কোন দেশে মেরি মরতে পারেনা আবার কোন দেশে মেরি সম্পূর্ণভাবে মৃত। মেরি আয়ারল্যান্ডের দক্ষিণের ক্যাথলিক শাসিত দ্বীপে অমর নন, কিন্তু উত্তরের প্রটেস্টান্ট মতাবলম্বীদের কাছে মৃত।
আমরা এই সব বিষয় নিয়ে কি করব? আসলে আমাদের করার তেমন কিছুই নেই। তুমিও কিছু করতে পারবে না। কিন্তু তুমি একটা জিনিস করতে পার। এরপর থেকে কেউ যদি তোমার সামনে কোন কিছুকে গুরুত্বপূর্ণ বলে, তাহলে তুমি নিজেকেই প্রশ্ন করবে-”এটা কি প্রমাণ সাপেক্ষ বক্তব্য? নাকি, প্রথা বা কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অথবা প্রত্যাদেশের কারণে বিশ্বাসযোগ্য।” এর পরে কেউ যদি তোমার সামনে কোনকিছুকে সত্য বলে, তাহলে তুমি জিজ্ঞাসা করবে “কি ধরণের প্রমাণ আপনার কাছে আছে“? তারা যদি এর কোন সদুত্তর দিতে না পারে, তাহলে আমি আশা করবো তাদের কথা বিশ্বাস করার আগে খুব সতর্কভাবে বিচার করবে।
(সমাপ্ত)
Posted by: অগ্নি on: এপ্রিল 30, 2008
আমি এই প্রথা বা ঐতিহ্য সম্পর্কে পরে এই চিঠির শেষে আলোচনা করব। কিন্তু তার আগে বিশ্বাসের অন্য দুই খারাপ অজুহাত ‘কর্তৃপক্ষের আদেশ‘ ও ‘প্রত্যাদেশ‘ সম্পর্কে কিছু বলে নেই।
কর্তৃপক্ষ (Authority) এই জিনিসটাকে আমরা খুব মানি। কারণ এখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো আমাদের কাছে আসে। আইন বা নীতিগত সমর্থন আমরা এখান থেকে পেয়ে থাকি। রোমান ক্যাথলিক চার্চে পোপ হচ্ছেন সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। যেহেতু তিনি একজন পোপ সেহেতু মানুষ বিশ্বাস করে যে তিনি কোন ভুল করতে পারেন না। ইসলাম ধর্মের মধ্যেও তেমনি দাড়িওয়ালা বৃদ্ধ আয়াতুল্লাহ হলেন একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা মান্যবর কর্তৃপক্ষ। এই দেশের অনেক মুসলমান খুন করার জন্য তৈরি হয়ে আছে। কারণ এর অনুমতি তারা ঐ আয়াতুল্লাহর কাছ থেকে পেয়েছে।
এর আগে আমি তোমাকে বলেছিলাম, রোমান ক্যাথলিকরা ১৯৫০ সালে ঘোষণা করে যে মেরির শরীর স্বর্গে তুলে নেয়া হয়েছে এ কথা তারা আগে থেকে বিশ্বাস করে আসছিল। আসলে আমি বলতে চাচ্ছি যে পোপ নিজেই একথা বলেছেন। তিনি নিজে একথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছেন। আর পোপ যেহেতু বলেছেন সেহেতু তা অবশ্যই সত্য এবং মান্য। এর কোন যথার্থ কারণ নেই, তারপরও পোপ বলে কথা। অন্য আর কারও কথার চাইতে পোপের কথাকে তোমার বেশি বিশ্বাস করতেই হবে। বর্তমান পোপ (১৯৯৫) তার অনুসারীদেরকে একাধিক সন্তান নেবার নির্দেশ দিয়েছেন। মানুষ যদি এই কর্তৃপক্ষীয় নির্দেশকে বিনাবাক্যব্যয়ে মেনে নিত তাহলে তা পরিণামে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ বয়ে আনত। অতিরিক্ত জনসংখ্যার কারণে রোগ-ব্যধি, যুদ্ধ-বিগ্রহ ইত্যাদি লেগেই থাকত।
হ্যাঁ, বিজ্ঞানের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেবার সময় আমরা অন্যের উপর নির্ভর করে থাকি। যেমন, আমি নিজে আলো যে এক লক্ষ ছিয়াছি হাজার মাইল বেগে ছুটছে তার প্রমাণ কখনো দেখিনি। আমি এ কথা বইতে পড়েছি। এখানে বইকে আমি কর্তৃপক্ষ বলে মনে করেছি। তবে এটা ওই কর্তৃপক্ষের চেয়ে ভাল। কারণ কর্তৃপক্ষকে তুমি কোন প্রশ্ন করতে পারবেনা। কিন্তু যথাযথ প্রমাণসাপেক্ষে বই লেখা হয় আর ইচ্ছে করলে যে কেউ এই প্রমাণগুলো নিজে নিজে পরীক্ষা করতে পারে। এটা খুবই স্বস্থিদায়ক। কিন্তু মেরির শরীর স্বর্গে তুলে নেয়া হয়েছে এ ঘটনার স্বপক্ষে একটা ছোট প্রমাণও কোন প্রিস্ট (ধর্মনেতা) দিতে পারবে না।
বিশ্বাসের পক্ষে তৃতীয় খারাপ কারন হল প্রত্যাদেশ বা ঐশী বাণী। মেরির সশরীরে স্বর্গারোহন বিষয়ে যদি পোপকে ১৯৫০ সালে জিজ্ঞাসা করা হত তাহলে তিনি প্রত্যাদেশের কথা বলতেন। তিনি কিভাবে এই প্রত্যাদেশ পেয়েছেন? একটু কল্পনা করে নিতে হবে। একদিন তিনি নিজের ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে প্রার্থনায় বসেছিলেন। ঈশ্বরের কাছে বারবার সাহায্য চাইলেন। নিজে নিজেই অনেক চিন্তা করলেন। তারপর নিজেই এক অনির্দেশ গভীর বিশ্বাসবোধ থেকে নিজ ধারণাকে বিশ্বাস করা শুরু করেন। বিশ্বাসী মানুষ যখন নিজের অন্তরের অন্ত:স্থলে এক গভীর বিশ্বাস বহন করেন, যখন নিজের মনের গহীনে এক ভিন্নরকম অনুভূতিকে চিহ্নিত করতে পারেন আর তখন তারা কোনরকম প্রমাণ ছাড়াই তাকে সত্য বলে মেনে নেন। এটাকে তারা প্রত্যাদেশ বা ঐশী অনুভূতি বলে থকেন। প্রত্যাদেশের দাবী শুধুমাত্র পোপ করেছেন তা নয়, অন্য ধর্মের মানুষরাও প্রত্যাদেশের দাবী করেন। বিশ্বাসের স্বপক্ষে প্রত্যাদেশকে তারা খুব জোরালো প্রমাণ বলে মনে করেন। কিন্তু সত্যিই কি এটা ভালো কারণ?
ধরো, তোমাকে বললাম যে তোমার প্রিয় কুকুরটা মারা গেছে। তাহলে প্রথমে তোমার মন খুব খারাপ হয়ে যাবে। হয়তো তুমি জিজ্ঞাসা করবে ‘তুমি কি নিশ্চিত? কিভাবে তুমি জানলে? কিভাবে এটা ঘটল?’ এখন ধরি, আমি বললাম -“আমি আসলে ঠিক জানিনা যে কুকুরটা মরেছে। এর কোন প্রমাণ আমার কাছে নেই। আমার মনের ভিতরে একটা অনুভূতির সৃষ্টি হল যে হয়তো সে মারা গেছে।” তাহলে ভয় দেখানোর জন্য তুমি আমার উপর কিঞ্চিৎ রেগে যাবে। কারণ তুমি জানো কারো মনের অনুভূতি কেউ মারা যাবার ঘটনা বিশ্বাস করার মত যথেষ্ঠ জোলালো ও গ্রহণযোগ্য নয়। এজন্য তোমার সঠিক তথ্য প্রমাণ দরকার। আমাদের প্রত্যেকেই সময়ে সময়ে মনের গভীরে বিভিন্নরকম অনুভূতি বোধ করি। কখনও সেগুলো সঠিক হয় কখনওবা হয় না। বিভিন্নরকম মানুষ প্রত্যেকের চাইতে ভিন্নরকম অনুভূতি বোধ করে। তাহলে কেমন করে তুমি কার অনুভূতিকে সত্য বলে গ্রহণ করবে? তাহলে কুকুরের মারা যাবার ঘটনা আমরা কিভাবে বিশ্বাস করতে পারি? যে নিজচোখে মৃত দেখেছে তার কাছ থেকে শুনে অথবা নিজে কুকুরের হৃদপিণ্ডের বন্ধ হওয়া পরীক্ষা করে কিংবা যিনি কুকুরটা মারা যাবার সময় উপস্থিত ছিলেন এমন কারো কাছ থেকে জেনে নিয়ে।
মানুষ কখনও কখনও বলে যে নিজের মনের গভীর অনুভবকে বিশ্বাস করতে হবে। না হলে স্ত্রীর ভালোবাসার উপর আস্থা রাখা সম্ভব হবে না। কিন্তু এটা ভুল যুক্তি। কারণ কেউ কাউকে ভালোবাসে কি না তা বোঝার অনেক উপায় আছে। চোখে দেখে ও কানে শুনেও ভালোবাসার প্রমাণ পাওয়া যায়। ধর্মীয় নেতারা যেমন বলেন তেমন এটা শুধুমাত্র মনে গভীরে অনুভবের বিষয় নয়। বাহ্যিক বেশ কিছু চিহ্ন দেখে মনের অনুভূতি বোঝা যায়। চোখের চাহনী, কথার কোমলতা, সহানুভূতি, সহৃদয়তা, এগুলো সবই সত্যিকারের প্রমাণ।
কখনও কখনও মানুষ কোন প্রমাণ ছাড়াই মনে করে তাকে অন্য কেউ ভালোবাসে। শেষ পর্যন্ত যদিও তা মিথ্যায় পর্যবসিত হয়, তবুও তারা নিজেদের বিশ্বাসে অটল থাকে। কেউ কেউ মনে করে যে সিনেমার নায়ক (বা নায়িকা = Actor) তাকে ভালোবাসে। যদিও তাদের কখনও দেখা হয়নি। তবুও এমন বিশ্বাস থেকে তাকে টলানো যায় না। এই ধরণের মানুষেরা আসলে মানসিকভাবে অসুস্থ। অন্তর্গত অনুভূতিকে বাইরের কিছু উপাদানের প্রেক্ষিতে প্রমাণ সাপেক্ষ হতে হবে, না হলে তাকে কোনক্রমেই বিশ্বাস করা যাবে না।
মনের গভীরের অনুভূতি বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রেও খুব প্রয়োজন। কিন্তু এটা শুধুমাত্র পরবর্তীতে প্রমাণের জন্য পরীক্ষণযোগ্য তবে এমন সব আইডিয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কোন একটা ধারণা যখন খুব সত্যি বলে মনে হয়, তখন বিজ্ঞানীরাও সে সম্পর্কে দৃঢ় ধারণা পোষন করেন। কিন্তু এটা তারা দীর্ঘসময়ব্যাপী পরীক্ষা চালানোর সুবিধার জন্য করে থাকেন। তারা ঐ দৃঢ় ধারণাকে ভিত্তি করে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে একটি যথার্থ প্রমাণ খোঁজার চেষ্টা করেন। বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন আইডিয়া খুঁজে পাবার জন্য নিজের মনের অনুভূতিকে ব্যবহার করেন। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত কোন প্রমাণ খুঁজে পান না ততক্ষণ নিজের মনের ভাবনার জন্য কোন দায়বদ্ধতা স্বীকার করেন না।